সেদিন বাসায় ফেরার পথে আঁকাবাঁকা পথ ধরলাম। এটা আমার স্বভাব বলা যেতে পারে। রেল লাইন পার হলাম। আপাত দৃষ্টিতে ফাঁকা রেললাইন দেখে ইনোসেন্ট মনে হলেও, মূলত রেল লাইন বা এর সাইড দিয়ে দ্রুত চলা যায় না। বরং এই রাস্তা পথচারিকে অদৃশ্য এক শক্তি দিয়ে টেনে ধরে, ফলে পথিকের পথচলা শ্লথ হয়ে যায় মনের অজান্তেই, সময় লেগে যায় বেশি।
আচ্ছা, রেল লাইন কি একাকী অনুভব করে? ওর কি অনেক রাগ?
যাইহোক, রেল লাইনের প্রাচীর পার হয়ে বিসমিল্লাহ টাওয়ারের সামনের রাস্তা ধরলাম। খেয়াল করলাম মাথার উপর অনেকগুলো বিগ সাইজ ব্যানার টাঙ্গানো। একটা বিশাল ব্যানার, সেখানে আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের খেলোয়াড়দের ছবি। ব্যানারের নিচের অংশে কিছু এদেশীয় নাম। আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের কোন কড়া সমর্থকদের কাজ নিশ্চয় এটা। অবধারিতভাবেই সামান্য দুরেই ব্রাজিলের জন্যেও তেমন একটি ব্যানার ঝুলছে। সবমিলিয়ে আরও কয়েকটি দলের জন্য ফুটবল পাগল মানুষেরা নিজেদের আবেগ প্রকাশ করেছে ব্যানার ঝুলিয়ে।
ব্যাপারটা খারাপ না, আনন্দের উপলক্ষ্যের দরকার আছে। তা প্রকাশ করে সংক্রামক বানিয়ে অন্যকে আনন্দিত করার ব্যাপারটা আরও দরকারী ব্যাপার।
আমার হঠাৎ মনে হলো, বাংলাদেশী মানুষের জীবনে ব্যানার, পোস্টার, ফেস্টুনের প্রভাব বিশাল। এটা রীতিমত গবেষণার দাবী রাখে। কালচার একটা বিশাল ক্যানভাস। সেই ক্যানভাসে বাংলাদেশিদের ব্যানারপ্রেম একটি অন্যতম অবিচ্ছেদ্য অংশ।
খেয়াল করে দেখুন, ঈদের শুভেচ্ছা জানাবে? ব্যানার! প্রতিবাদ জানাবে? ব্যানার! সমর্থন জানাবে? ব্যানার! নিজেকে চেনাবে? ব্যানার! এ যেন উপলক্ষ্যের শেষ নেই ব্যানারের ব্যবহারের। এই ব্যানার মাঝে মাঝে আপনাকে আনন্দ দিবে, আবার বিরক্ত করবে।
একটা সময় এইসব ব্যানার হাতে লেখা হতো। শুধুমাত্র ব্যানার লেখার উপরেই একটা শিল্প দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো। সেসব আজ প্রায় অতীত। এখন গ্রাফিক্স কিংবা এআই দিয়ে ডিজাইন করেই প্রিণ্ট, কিন্তু ব্যানার আছেই।
আসুন, আরেকটি ইন্টারেস্টিং কালচারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই।
সমর্থন করার স্টাইল কেমন? সেটা কোন রাজনৈতিক দল হোক, বার প্রিয় খেলার দল হোক, কিংবা সিনেমার নায়ক-নায়িকার দল হোক; এই উপমহাদেশে সমর্থক হতে হলে আক্রমনাত্মক হতে হবে, এটা অবশ্যক। আপনি এগ্রেসিভ না হলে শক্তিশালী সমর্থকই নন। যতই ইন্টেলেকচুয়াল সমর্থক হন, আপনাকে এগ্রেসিভলি জানান দিয়ে বোঝাতেই হবে আপনি একজন সমর্থক। তো এই কালচারের বৈশিষ্ট্য কেমন?
আপনার ভিন্ন দলের সমর্থককে বিদ্রুপ করতেই হবে, এবং সেটা ব্রুটালি। এই যে সেদিন একটি ভিডিওতে দেখলাম, কোনো একটি মফস্বল এলাকায় একটা শিশু একটি ফুটবল দলের জার্সি, আর লুঙ্গি পরে আনন্দচিত্তে রাস্তায় হাঁটছে। রাস্তার মোড়ে থাকা কিছু যুবকের একজন বাচ্চাটাকে তাড়া করে লুঙ্গি উঁচু করে ধরে রাখলো। ছাড়া পেয়ে বাচ্চাটা কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ালো। কী পরিমাণ লজ্জা বাচ্চাটা পেয়েছে, কী পরিমাণ ট্রমা ওর মধ্যে কাজ করবে তা ঐ উন্মাদ ছেলেগুলোর পিতাও জানে না, সেতো নই ই। আজই একটি খবরে দেখলাম, গতকাল ব্রাজিল হেরে যাওয়ায় তীব্র বিদ্রুপে মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে একটি ছেলে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। আমি নিজেও দেখলাম গতরাতে ব্রাজিলের হারে আমার পাশে থাকা ব্যক্তিটি চোখের পানি ছেড়ে কাঁদছে, পুরো খেলা জুড়ে দুই হাত মুনাজাত ধরে থাকতে। এগুলো আবেগী ব্যাপার বটে, কিন্তু আবেগ তো এক্সিস্ট করে, সত্য, আবেগেই তো মানুষ প্রেম বিয়ে করে, বাচ্চা উৎপাদন করে, ভালোবাসে, ঘৃণা করে, দলকে ভালোবাসে।
যাইহোক, সিরিয়াস কথাই চলে যাচ্ছি।
‘সমর্থক’ কালচারের বৈশিষ্ট নিয়ে বলছিলাম।
একেকজন একেকটি বিষয় সমর্থন করবে এটাই তো স্বাভাবিক। যার মতো সে সমর্থন করবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু না, সমর্থন এখানে পূর্ণতা পায় না! নিজের সমর্থন সেরা সেটা প্রমাণ করতে অন্যেরটাকে খাটো করা চাই-ই চাই। তুমুল বিতর্ক, তর্ক, মারামারি হতেই হবে, তবেই তো সমর্থন। জমি বেচে পতাকা বানাতে হবে, নতুন নতুন ঘটনার জন্ম দিয়ে আলোচনায় থাকতে হবে তবেই তো সমর্থক!
আসলেই চুপচাপ সমর্থন করাটা আনন্দের নয়। নিজের সমর্থনে অবশ্যই কথা বলতে হবে, অন্যকে একটু পচাতেও হবে, নাহলে সত্যিকার অর্থে এই কাজের কোনো মজা নেই।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির গত ৫ মাস যদি খেয়াল করে থাকেন, দেখবেন ডিজিটাল মাধ্যম কী গভীরভাবে ব্যবহৃত হয়েছে পক্ষে-বিপক্ষে সমর্থন প্রকাশ করতে, একে অন্যকে ট্রল করতে। এসব আসলেই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।
তবে আমাদের ভূখণ্ডের ‘সমর্থন’ চরিত্র আসলেই ভিন্ন।
আমাদের বাসার গলির ছেলেরা এমাথা-ওমাথা পুরোটাই পতাকা ঝুলিয়েছে। না একটি দেশের নয়, বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশ নেয়া সবকটি দলের পতাকাই সেখান স্থান পেয়েছে, আছে বাংলাদেশের পতাকাও। জুনিয়র ছেলেদের টিম নিয়ম করে সেগুলো মেইন্টেইন করে, কোনো পতাকা ভাজ হয়ে গেলে লম্বা লগা দিয়ে সেটাকে আবার ঠিক করে দেয়। এটা এই গলির প্রতি বিশ্বকাপের কালচার। সবাই একসাথে পতাকা ঝুলায়, একসাথে স্ক্রিনে বসে খেলা দেখে, কিন্তু দল ভিন্ন।
শেষ করি একটি ঘটনা দিয়ে। সেদিন বিকেলে বের হচ্ছি। ৫-৬টা শিশু, ওরা পাশের মাদ্রাসায় পড়ালেখা করে, ইউনিফর্ম পরা ছিলো, ব্যাগ ছিলো। ওরা খেলা করছে। ওদের খেলা ছিলো, জুতা ছুড়ে উপরে মারতে হবে, আর নিজের বিপক্ষ বা অপছন্দের দলের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিতে হবে। আমি মজা পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ওদের স্লোগান ছিলো- গুলিস্তান-মতিঝিল; হাইরা যাবে ব্রাজিল।
জুতা বিভিন্ন পতাকায় লাগছে, ওরা আনন্দ পাচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যে একজনের জুতা গিয়ে লাগলো ফিলিস্তিনের পতাকায়, ছেলেটি জিহ্বায় কামড় দিলো, বলে উঠলো- ‘অস্তাগফিরুল্লাহ’।
