রাজধানী ঢাকাতে যারা পাবলিক ট্রান্সপোর্টে যাতায়াতে বাধ্য, এবং সেটা নিয়মিত, তাদের কাছে এই শহর নরকের মত। মিরপুর রোড তেমনই একটি ‘নরকের রোড’। গুরুত্বপূর্ণ রোড হওয়ায় এই রোডে প্রায়শই যানজট লেগে থাকে।
কিন্তু ‘নরক রোড’র পাশেই একটুকরো ‘স্বর্গ’ আছে। নাম ‘ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ’!
ধুলোবালি, বায়ুদূষণ, অনিরাপত্তা, মিছিল-মিটিং, অপরাজনীতি আর মবের এই শহরে যদি কোনদিন রেসিডেন্সিয়াল কলেজের ক্যাম্পাসে আপনার প্রবেশের সুযোগ হয়, তাহলে নিশ্চয় আপনি আমার এই লেখার সাথে একমত হবেন।
এমন গোছানো, সাজানো, হৃদয় শীতল করা ক্যম্পাস আপনি বহু বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরেও পাবেন না। আমি ভাবি, এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা একটা সময় পর উচ্চশিক্ষার অর্জনের জন্য এখানকার পাট চুকিয়ে যায়। কীভাবে যায়? কীভাবে এই ক্যাম্পাসের মায়া ত্যাগ করে?
একইভাবে ভাবি, এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কথাও, তাঁরা কি চাকরি বদলানোর চিন্তা করেন? বা পেশাজীবন শেষে চলে যাওয়ার সময় কেমন লাগে?
যাকগে, যা লেখার জন্য বসলাম সেটাই এবার লিখি।
এই প্রতিষ্ঠানে ৮ মে ২০২৬, শুক্রবার সকাল সাড়ে ৫টায় একটা মিনি ম্যারাথনের আয়োজন করা হয়েছিলো, নাম ছিলো- ‘1st DRMC Intra 52 Acre Dash 2026’। আয়োজন করেছিলো এই প্রতিষ্ঠানে থাকা অনেকগুলো ক্লাবের অন্যতম একটি ক্লাব ‘ডিআরএমসি অ্যাডভেঞ্চার এন্ড ট্যুর ক্লাব’। ম্যারাথনের মত ইভেন্ট এবারই প্রথম।
আমি এই কলেজের রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জনাব মাসুম বিন ওহাব এর অতিথি হিসেবে অংশ নেয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। মানে বুঝতে পারছেন? এই এক টুকরো স্বর্গের ভেতর দিয়ে, ভোরের শীতল বাতাসের ঢেউ চিরে, কংক্রিটের আঁকাবাঁকা রাস্তার দু’পাশে থাকা মায়া ছড়ানো গাছের ছায়া গায়ে মাখতে মাখতে, এখানকার সৌভাগ্যবান শিক্ষার্থীদের সাথে দৌড়াতে পারার সুযোগ।
কাজেই, এই ভেন্যু থেকে আমার বাসস্থানের দূরত্ব বিশাল হলেও, ভোরের আঁধার আর এই শহরের নীরবতায় চলার ঝুঁকি জয় করে সঠিক সময়েই পৌঁছে গেলাম।
বাচ্চারা কী দারুণ আয়োজন করেছে। দিনটি শুরুই হলো ভালো লাগা দিয়ে। নির্দিষ্ট সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে বিব, জার্সি, চকলেট সংগ্রহ করলাম, মাসুম ভাইয়ের সাথে জয়েন করলাম। মাসুম ভাইয়ের মাধ্যমে অনেক সম্মানিত শিক্ষকের সাথে পরিচিত হলাম। তাঁদের মধ্যে অনেকেই আমার নিজ জেলা ও পাশের জেলার মানুষ। ভাবছিলাম, কী আশ্চর্য, বিভিন্ন গ্রাম থেকে এসে এই শহরের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করছেন!
এই কলেজের স্পোর্টস টিচার জনাব এম মাহফুজুল হক একজন আলট্রা রানার, তাঁর সাথে পরিচয় হলো, দৌড়ের কিছু টিপস পেলাম উপহার হিসেবে।
বাংলা বিভাগের প্রভাষক জনাব মো. তারিকুল ইসলামের চমৎকার উপস্থাপনা উপভোগ করলাম, ইভেন্টের শুরু ও শেষে।
সুযোগ্য অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জনাব ড. জাবের হোসেন চমৎকার বক্তব্য দিলেন। তাঁর উপস্থিতির পুরো সময়টা ছিলো খুবই ইন্সপায়ারিং, আমি জাস্ট দেখছিলাম যে, কী প্রাণচঞ্চল করে রেখেছিলেন তিনি।
আমাদের দৌড় শেষ হলো খুবই সুশৃঙ্খলভাবে। পর্যাপ্তসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবী, পানিপানের ব্যবস্থা ছিলো। প্রথমেই একটি চকলেট পেয়েছিলাম, শেষে পেয়েছিলাম ইলেক্ট্রোলাইট ড্রিংক। পাঁচ রাউন্ড দৌড়ের প্রতিটি রাউন্ড শেষে পেয়েছিলাম একটি করে কালারফুল রিস্ট ব্যান্ড। ফিনিশার হিসেবে পেয়েছিলাম চমৎকার একটি মেডেল ও সনদপত্র সাথে চকলেট বিস্কিট।
বটমূলের ছায়ায় বেদির উপরে বসে অনেকটা সময় কাটালাম মাসুম ভাইয়ের সাথে নানান রকমের গল্প করে। ব্যাকড্রপ ফাঁকা হলে কিছু ছবি তুলে দিলেন তিনি। অধ্যক্ষ স্যারের সাথে ছবি তুলতে চেয়েছিলাম, তিনি সেই আবদারও পূরণ করলেন।
যেহেতু রেসিডেন্সিয়ালের অধ্যক্ষ স্যারকে ইতোপূর্বে দেখি নি, সুতরাং আমার মানসপটে তাঁর একটি ছবি তৈরি হয়েছিলো। খুব কঠোর চেহারার, রাশভারী একজন মানুষের একটি অবয়ব আমার মনের ভেতর ছিলো। কিন্তু ইভেন্ট শুরুর আগে মঞ্চে তাঁকে দেখে সেই অবয়ব নিমিষেই বদলে গেলো। আগের জায়গায় একজন মাইডিয়ার টাইপ মানুষ প্রতিস্থাপিত হলেন।
মাসুম ভাই আমাকে ছবি তুলতে নিয়ে গেলে, কাছে গিয়ে সালাম দিলাম, তিনি পাশে নিয়ে দাঁড়ালেন। ছবি তোলা শেষে আমাকে অবাক করে দিয়ে হাত বাড়িয়ে করমর্দন করলেন। এবং তখনই অনুভব করলাম চেহারা ও বক্তব্যে কোমল ভাইব থাকলেও, তিনি একজন মিলিটারি ব্যক্তিত্ব।
একজনের কথা বলতে ভুলে গিয়েছি, একজন শিক্ষক, আমার ভুল না হলে তিনি ডিআরএমসি অ্যাডভেঞ্চার এন্ড ট্যুর ক্লাবের প্রধান। তাঁর সূচনা বক্তব্য খুবই গোছানো এবং শ্রুতিমধুর ছিলো। একটি জায়গায় অনেক কিছুই উপভোগ করার থাকে, খুঁজে নিতে হয় সম্ভবত। তাঁর খুব সংক্ষিপ্ত বক্তব্য আমি উপভোগ করেছিলাম।
বিশ্বের প্রথম ভিলেজ ম্যারাথন আয়োজক দেশ বাংলাদেশ। সেই আয়োজক টিমের প্রধান মাসুম ভাই। তিনি প্রতিবছর তাঁর টিম নিয়ে যশোর জেলায় ‘ভিলেজ ম্যারাথন’ আয়োজন করে থাকেন। তাঁর কলেজে হওয়া ম্যারাথনে অংশ না নিতে পারলে খুব মন খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো।
বেলা বাড়ছে, সূর্য তাপ বাড়াচ্ছে, ক্যাম্পাস ফাঁকা হয়েছে প্রায়, মাসুম ভাইয়ের সাথে গল্প করা শেষ হচ্ছে না। কিন্তু আমাদের ফিরতে হবে। ভাইয়ের লোভনীয় মোহাম্মদপূরীয় সকালের নাস্তার নিমন্ত্রণ বিনয়ের সাথে ফিরিয়ে দিয়ে ঘরের পথ ধরলাম।
আচ্ছা, এতকথা লিখলাম, কিন্তু ডিএমআরসি’র এই ম্যারাথনে অংশ নিতে পেরে আমার কেমন লাগলো সেই অনুভূতি তো জানানো হলো না। থাক, এবার আর লিখবো না।

