খোদার প্রেম 

আমার অফিস ঢাকার বাইরে। শীত ও গরম প্রধান একটি শহর। শীতকালে তীব্র শীত, গরমকালে ভ্যাপসা গরমে দম বন্ধ হওয়ার জোগাড় হয়। শীত একদমই আমার শরীরে সয় না। 

মাঘ মাসের পয়লা সপ্তাহে বার্ষিক সাধারণ সভায় যোগ দিতে গেলাম। ট্রেন যখন পৌছালো, সন্ধ্যা পেরিয়ে তখন রাত শুরু হয়ে গিয়েছে। 

অফিসে পৌছালাম, আমাদের রাতের অফিস। কলিগদের সাথে কুশল বিনিময় ও সেদিনের নির্ধারিত ম্যানেজমেন্ট মিটিং ও ফরমালিটিজ শেষ করতে করতে রাত সাড়ে দশটা। 

রহমানিয়া হোটেল থেকে খেয়ে ব্যাক করলাম অফিসে। আমার বিভাগীয় কলিগদের সাথে আরও কিছুক্ষণ এটাসেটা নিয়ে আলাপ চললো। আলাপ চলমান অবস্থায়ই অনুভব করলাম, আমার শরীর কাঁপছে, বিশেষ করে পা। বুঝলাম শীতে ধরেছে। চেয়ারে গিয়ে পা উঠিয়ে বসতে হবে। আমার রুমে গিয়ে দরজা আটকে দিলাম, যেন একটু উষ্ণ হয়। কাজ শুরু করলাম। কিন্তু সময় যত এগিয়ে যায়, আমার খারাপ লাগা বাড়তেই থাকে। 

আমি দরজা লাইট অফ করে টেবিলের উপর শুয়ে পড়ি লাগেজে থাকা কম্বল জড়িয়ে। অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি বুঝতে পেরে বাসায় ফোন করে কথা বলে নিলাম, যতটা পারা যায় স্বাভাবিক ভাব ধরে রেখে বাসায় রুটিন কথা বলার কাজ শেষ করে তাদেরকে নিশ্চিন্ত রাখলাম। 

আমার অবস্থা খারাপ হচ্ছে আরও। মানে বেশ কাঁপুনি অনুভব করছি। এখনও ভাবছি শীতে ধরেছে ভালোমত, কিন্তু ইউনিক আমার জন্য। ভাবছি আমাকে হাসপাতালে নিতে বলবো কি না, যেহেতু মেইন শহরে আছি, কাছেই মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল আছে। 

নানান রকমের চিন্তা মাথায় লাফালাফি করছে। যদি হাসপাতালে নিয়ে যায়, মন্দ কিছু হলে আমার ফ্যামিলি কলিগদেরকে সন্দেহ করতে পারে, সেটা অফিসের ভেতরে হলেও করতে পারে। কিছু না করেই ঝামেলায় পড়বে। আবার ভাবছি, ফ্যামিলি জানলে কি মানসিক চাপেই না পড়বে। কলিগদের জানালে আমাকে নিয়ে উটকো টানাটানির মধ্যে পড়বে এই সদ্য যৌবনে পা দেয়া রাতে। একদম খারাপ কিছু হলে কতরকমের ঝামেলা সবাইকে পোহাতে হবে। 

এসব ভাবতে ভাবতে ঘন্টা দুয়েক পার করে ফেলেছি প্রায়। এখন আর ভাবার মত অবস্থায় নেই। কী মনে হলো, দ্রুত স্মার্ট ওয়াচ দিয়ে আমার প্রেশার চেক করলাম। দেখি প্রেশার ফল করেছে আশংকাজনকভাবে। এতক্ষণে বুঝলাম কী কারণে এই কম্পন। সাথে সাথে এটাও বুঝলাম, আমার ইমারজেন্সি মেডিসিন প্যাকেট ভুলে বাসায় ফেলে এসেছি! 

 

এবার আর কিছু করার নেই, পাশের রুমেই আমার টিম কাজ করছে। ওরা কিছুই জানে না এখনও। আমার কলিগ জুনায়েদকে জাস্ট মেসেজ দিলাম, ‘জুনায়েদ, প্লিজ মিট মি এসাপ’। ও মুহূর্তেই দরজায় নক করে অনুমতি চাইলো। অন্ধকার দেখে অপেক্ষা না করে ভেতরে আসলো। বললাম, স্যালাইন আছে? 

-না

– তাহলে প্লিজ একটু লবণ মিক্স করে নিয়ে আসেন এই বোতলে দ্রুত। 

ও আনলো খুব ক্ষিপ্রতার সাথে। দেখি উঠে বসে পানি পান করার মত সামর্থ্য প্রায় হারিয়েছি। কষ্ট করে পান করলাম। ওকে এরমধ্যে সরি বলে পাঠিয়ে দিলাম। জুনায়েদ যেকোন প্রয়োজনে জানাতে বললো, হাসপাতালে যাবো কি না জিজ্ঞেস করলো। যাবো না বললাম, ও বিদায় নিলো। শুয়ে পড়লাম। 

 

কাঁপুনি বেড়েছে, আরও কয়েকগুন। 

 

মিনিট পাঁচেক বাদে জুনায়েদ একটা ওরস্যালাইন নিয়ে আসলো। বোতল এগিয়ে দিলে সেটা গুলিয়ে আনলো। আগের চেয়ে কষ্ট করে হাফ বোতল পান করলাম। জুনায়েদকে বিদায় দিলাম, বললাম দরকার হলে হেল্প চাইবো। 

 

এই আড়াই ঘন্টা সারাক্ষণ আল্লাহকে ডেকেছি। নানান বাক্যে বিপদমুক্ত করতে আর্জি জানিয়েছি। 

স্যালাইন পান করেছি বটে। মনে বল আনার চেষ্টা করেছি, তবে শরীরে লেশমাত্র ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি এখনও। ক্রমেই বেড়ে চলেছে কাঁপুনি, পুরো শরীর। 

 

কখন যে সমস্ত বাক্য বাদ দিয়ে, শুধুমাত্র একটাই শব্দ ‘আল্লাহ’ উচ্চারণ করে চলেছি জানি না। কারণ একটা সময় এই শব্দটাও উচ্চারণ করছি কয়েক সেকেন্ড সময় ব্যয় করে। এভাবে চললো রাত প্রায় ২টা পর্যন্ত। এই দুটো পর্যন্ত অন্য কোন শব্দ ভাবি নি, বলি নি। শুধুমাত্র একটা শব্দই আউড়েছি, তাও শব্দ করে, শব্দ আপনাতেই বের হয়ে আসছিলো কোঁকানো স্বরে,’আল্লাহ’। 

 

হঠাৎ আমি নীরবে হেসে উঠলাম, মুচকি হাসির মত। অসুস্থতা অপরিবর্তিত এখনও। 

আমার অদ্ভুত এক চিন্তা হলো এরমধ্যেই- মানুষ প্রেম করে, প্রেমের মানুষকে নিজের প্রতি অনুগত রাখতে চায়, নিজের প্রতিই যেন সমস্ত আকর্ষণ, মনোযোগ থাকে, সেটাই চায়। কিন্তু মানুষের সীমাবদ্ধতা আছে, চাইলেই সে তা পারে না, পায় না। 

কিন্তু সৃষ্টিকর্তার তো সেই ক্ষমতা আছে। যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি তাঁর সৃষ্টিকে তীব্রভাবে ভালোবাসে এই ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নেই। 

 

সৃষ্টিকর্তার ডাক উপেক্ষা করা যায় না। তাঁর প্রেম উপেক্ষা করা যায় না। তবু আমি প্রতিমুহূর্তে তাঁকে ভুলে থাকি, পাপে ডুবে থাকি, যেন সৃষ্টিকর্তা আমার কেউ নন। 

আমার অনুভব হয়েছিলো- তিনি সংক্ষিপ্ত একটি প্রেমের খেলা খেললেন সেদিন। যে খেলায় আমি শুধু তাঁকেই ডাকতে থাকবো। একটি ন্যানো সেকেন্ডের জন্যেও তিনি ভিন্ন অন্য কোন শব্দ ভাবতে পারবো না। এবং আমি সেটাই করেছি, তিনি যেটা চেয়েছেন। 

কী দুনিয়া চুরমার করা প্রেম বান্দা আর খোদার মধ্যে হতে পারে, সেটাই কেন অনুভব করলাম তা জানি না। তবে খোদার প্রেম, খোদার ডাক, খোদার ভালোবাসা খুবই ভয়ঙ্কর। সম্ভবত এই ভয়ঙ্কর ভালোবাসা ধারণ করেন বলেই, তিনি শত অবাধ্য হওয়ার পরেও আমাকে খাবার দেন, ‘বিসমিল্লাহ’ না বললেও গলায় খাবার আঁটকে দেন না, আবোল তাবোল কথা বললেও জবান বন্ধ করে দেন না- হয়তো কোন একদিন জবান দিয়ে প্রেম মাখিয়ে ডাকবো- ‘আল্লাহ’। 

 

ফজরের আজান শুনলাম। আধাঘন্টা হলো কাঁপুনি কমে এসেছে। এক ফোঁটা দুই ফোঁটা করে স্যালাইনের পানি পান করার চেষ্টা চালিয়েছি লাস্ট ঘন্টা খানেক, ফোঁটা ফোঁটা স্যালাইনের পানি যে কতটা ইফেক্টীভ, তা বুঝলাম। 

সকাল ১১টায় মিটিং, ১০টায় ভেন্যুতে রিপোর্টিং; ফোনে এলারম দিয়ে আবার শরীর এলিয়ে দিলাম। কিছু সময় ঘুম হলো। 

শুধুমাত্র খোদা জানেন, আজ আমি নতুন জীবন শুরু করলাম। তিনি ছোট্ট করে একটা ডাক দিয়েছিলেন, ভালোবেসেছিলেন। 

ভেন্যুতে গিয়ে জুনায়েদকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে দিনের কাজ শুরু করলাম।

Scroll to Top