রিকশা থেকে নেমে হেঁটে গেলেই ভালো হতো। কিন্তু একেতো পায়ে কুলায় না, অন্যদিকে তীব্র রোদে তীব্র তাপ। তবে বসে থাকতে খারাপ লাগছে না। পাশের রিকশার এই ভাইয়া এই তীব্র জ্যামের কারণে সরকারের চৌদ্দগোষ্ঠি উদ্ধার করে দিচ্ছে। আমি বসে বসে বক্তৃতা শুনছি, কটকটা রোদের ভেতর ঝাঁজালো বক্তব্য, মন্দ না, নতুন রেসিপি।
ভাইজান, দেখতে বেশ স্মার্ট, বাংলার সাথে কিছু ইংরেজি শব্দের একটা দুর্দান্ত কম্বিনেশন দিয়ে ঝাড়ছেন। সব শব্দ বুঝতে না পারলেও শুনতে খুব একটা মন্দ লাগছে না। এই অবস্থায় আমারও বকা দিতে ইচ্ছে হচ্ছিলো, কিন্তু সাহসে কুলায় না। আমারটা পাশের ভাইয়া দিয়ে দিচ্ছেন, মনে মনে ডাবল থ্যাঙ্কস দিলাম। একটা থ্যাঙ্কস আমার বকাটা দিয়ে দেয়ার জন্য, আরেকটি ইংরেজিতে দেয়ার জন্য।
আমার পাশের রিকশার আরোহী ইংরেজিতে গা/লিগালাজ করছে, এটা ভাবতেই নিজেকে ক্লাসি ব্যক্তি মনে হচ্ছে। দুয়েকজন পরিচিতজনের সাথে আজকে দেখা করতেই হবে, আলাপের মাঝে একটু ভাব নিয়ে বলবো- আজকাল বাংলায় মনে মনেও ভাবতে পারি না কিছু, রাস্তায় বের হলেও পাশের রিকশার প্যাসেঞ্জার ইংলিশে বক্তব্য দেয়।
রিকশার টুংটাং শব্দে ভাবনায় ছেদ পড়লো। জ্যাম ছুটেছে, মেট্রো স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। দৌড়ে উপরে উঠে গেলাম, একজনের আগে যেতে পারলেও টিকেটটা আগে কিনতে পারবো। যথারীতি বিশাল লম্বা সিরিয়াল। মতিঝিল স্টেশনের এটা নিয়মিত চিত্র। কষ্ট করে একটা বগিতে নিজেকে গুঁজে দিতে পারলেই বাসে বসে অনন্তকালের ট্রাফিকে বসে থাকার যন্ত্রণা থেকে বাঁচা যায়।
টিকেটের সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমি বিশাল ধৈর্য নিয়েই স্টেশনে আসি। লম্বা সিরিয়ালের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকি নির্বিকার, একটা সময় কাউন্টারে পৌছাবই।
৪৮ মিনিট পর আমি যখন কাউন্টার থেকে ৪জনের পেছনে আছি, তখন একজন এসে আমাকে রিকোয়েস্ট করছে- ভাই, আমি উত্তরা যাবো, আমার টিকেটটা আপনার সাথে কেটে দিবেন? এত লম্বা লাইন দাঁড়িয়ে থাকাটা কঠিন, আমার একটু তাড়াও আছে।
আমি অবাক হয়ে লোকটার দিয়ে তাকিয়ে আছি। এতো সেই ভাইয়া, আমার পাশের রিকশার প্রতিবেশী যাত্রী, ইংলিশে বকা দেয়া ভাইজান, তাবৎ অনিয়মের বিরুদ্ধে বলিষ্ট কণ্ঠস্বর। আমার কি প্রাউড ফিল করা উচিৎ তাকে টিকেট কিনতে হেল্প করে? আমার পেছনে অপেক্ষমান জনা ষাটেক লোকদের সাথে কি পরামর্শ করে নিবো?
