সামান্য ফুচকাওয়ালা!

আমার বন্ধু রাজীব খান। ওর সাথে বহুদিন পর দেখা। সেই দেখা হওয়ার কাহিনী আবার বিরাট ইতিহাস।
আমি ওকে জানালাম দেখা করবো, কোথায় তোকে পাওয়া যাবে জানা। ও আমাকে বললো, তুই কবে কখন আসবি সেটা জানালে বলতে পারবো কোথায় আসলে আমার দেখা পাবি।
এটা শুনে আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। বললাম- মানে কি, তুই কি ফেরারি হয়ে গিয়েছিস? আজ এখানে তো কাল ওখানে!
– আরে ব্যাটা না, আগে টাইম ফিক্স করে আয়, তখন বুঝবি।
– আচ্ছা নেক্সট বুধবার, বিকেলে।
– তাইলে ধলা নদীর পাড়ে ৭ নম্বর ঘাটে চলে আসিস।
 
ওর এই ঠিকানার ধরণ দেখে আমি নিজেই ভয় পেয়ে গেলাম। পুরাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের স্টাইলের ঠিকানা। বন্ধুর সাথে দেখা করতে গিয়ে কি বিপদ ডেকে আনলাম?
 
বুধবার বিকেলের একটু আগেই পৌছে গেলাম। গিয়ে দেখি এলাহি কান্ড!
একটা ছোট কাভার্ডভ্যান টাইপ গাড়ী, সেটার ডান সাইড কেটে চমৎকার করে শাটার লাগানো। গাড়ির পেছনে যে গেইট থাকে সেখানে একটা ছোট সিড়িমত করা। ভেতরের দেয়ালে অনেকগুলো শেলফ, একপাশে আধুনিক চুলা, সামনে কাউন্টারটপ, সেখানে হরেক রকমের খাবার আর খাবার বানানোর মশলা। মোটা দাগে এটা একটা ফুচকার দোকান, কিন্তু বেজায় আভিজাত্য লাগানো দোকান।
মানুষ মৌমাছির মত ঘিরে রেখেছে সেই ফুডভ্যানকে, সবার মাথায় টুপি, সম্ভবত মাদ্রাসার ছাত্র। দোকানদারকে দেখা যাচ্ছে না মানুষের ভীড়ে, খুব কষ্টে যাকে দেখলাম তিনিও পেল্লায় একজন হুজুর।
আমি রাজীবকে খুঁজে না পেয়ে কল দিলাম। দেখি দোকানদার হুজুর কল রিসিভ করে আমাকে বলছে- ব্যাটা, আমাকে চিনতে পারতেছিস না? গাড়ীর পেছনে সিড়ি আছে, উঠে চলে আয়।
 
আমি হতভম্ব হয়ে গাড়িতে উঠে দেখি গাড়ির পেছনের অংশ দুই ভাগ করে একপাশে দোকান, আরেকপাশে ছোট একটা খুপরিকে পুরাই ড্রয়িং রুমের বাচ্চা বানিয়ে ফেলেছে। রাজীব ব্যস্ত, আমি চুপ করে রইলাম, ঘোর কাটাচ্ছি।
কিন্তু আমার জন্য আরও বিস্ময় অপেক্ষা করছে!
 
ঘন্টা খানেক পরে রাজীব ভেতরে আসলো। বসিয়ে রাখার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বললো- আই অ্যাম নট সরি। ফুচকা খাবি? ভালো বানাই কিন্তু। নাহলে কফির ব্যবস্থা আছে।
 
আগে বলতো, এসব কী ব্যাপার?
সব বলছি, কী খাবি সেটা বল, খেতে খেতে সব জানতে পারবি।
 
তো রাজীবের কাছ থেকে যা জানলাম, তাা আপনাদেরকে সংক্ষেপে বলি।
রাজীবের ফুড ভ্যানের বর্ণনা তো কিছুটা দিয়েছি। ও সকালে একটা স্কুলের সামনে ওর গাড়ি সেট করে, বারোটার পরেই একটা ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে গিয়ে সেট করে, সেখান থেকে বিকেলে একটা মাদ্রাসার সামনে গিয়ে সেট করে।
 
আসল ঘটনা এখনও বলিনি।
ও যখন স্কুলের সামনে ফুডভ্যান চালায়, তখন ওর গেটাপ থাকে এলাকার পরিচিত ভাই বা মামার মত। হাফহাতা চেকশার্ট, একপাশে সিঁথি করে আচড়ানো চুল, কালো চিকন ফ্রেমের একটা চশমা পরা। স্কুলের বাচ্চা থেকে অভিভাবক সবাই পাল্লা দিয়ে ওর ফুচকা খায়।
 
এরপর যখন ভার্সিটির ক্যাম্পাসে যায়, তখন চুল করে স্পাইক, টিশার্ট, চোখে গোল্ডেন ফ্রেমের সানগ্লাস, গলায় মোটা রূপালী চেইন, দেখতে পুরাই র‍্যাপারের মত। এই বর্ণনা দেয়ার সময় বললো- দোস্ত, আমার গাড়ি, খাবারের সাথে আমার এই গেটাপ ভার্সিটির পুলাপান খুব খায়!
 
বললাম- আর বিকেলে যে গেটাপে দেখলাম?
রাজীব দাঁত কেলিয়ে আবার গল্প আরম্ভ করলো- দোস্ত, বিকেলে যেখানে দেখলি, ওটা বিরাট মাদ্রাসা, হাজার হাজার শিক্ষার্থী। আমার গাড়ি, ডেকরেশন, খাবারের মান তো ঠিকই আছে, জাস্ট আমার চুল আর দাড়ির জেল ধুয়ে নিজের গেটাপটা ওদের মত করে নিই, ব্যাস। ওরা ভাবে আমি ওদের লোক।
 
আমি ওর কথা শুনে পাথর হয়ে গিয়েছি। বললাম- দোস্ত, তুই তো নিজেই বিরাট বিশ্ববিদ্যালয়, তোর কাছে আমার প্রতিদিন আসা উচিৎ।
– ধুর ব্যাটা, ফাইজলামি করিস! এইটা মনে করে ব্যবসার স্টাইল। একেকজনের একেক স্টাইল থাকে, এইটা আমার স্টাইল। আমি সামান্য ফুচকাওয়ালা!
 
বুঝলাম, তুই সামান্য! ফুচকাওয়ালা। যাইহোক, তোকে দেখে ভালো লাগলো, তোর ফুচকাও ভালো লাগলো। মাগনা ফুচকা খাওয়ার জায়গা পেয়ে আরও ভালো লাগলো। এখন আসি।
 
হে হে হে, আসিস দোস্ত, দেখা হলে ভালোই লাগে। এখন জেগে গেলি কোথায় গেলে আমাকে পাবি। ফুচকাওয়ালার সাথে মাঝে মাঝে দেখা করতে আসিস। একটু বস, আমার গাড়ী আসতেছে, তোকে পৌঁছায়ে দিয়ে আসবে।
দোস্ত, আজকে আর অবাক করিস না, নিতে পারতেছি না কিন্তু। একেতো একই অঙ্গে তিন রূপ দেখাচ্ছিস, আবার ফুচকাওয়ালার প্রাইভেট কার!
 
আরে ব্যাটা, নতুন কোন বেশ পাইলে তো সেই বেশও ধরবো। তখন দেখিস রূপ কয়টা বের হয়।
আলবিদা দোস্ত, আজ আর নয়!।
Scroll to Top