বেনসন সমাচার
সেলিম হোসেন
শহর থেকে ফিরে মাত্র এলাকার বাজারে পা রেখেছি। সবে দুপুর গড়িয়েছে, বাজার জমে নি, আমারও এখন বাজারে থেকে কাজ নেই। বাড়ির পথে হাঁটা শুরু করলাম।
রাস্তার মাথার চায়ের দোকানে চোখ পড়তেই দেখি আমার স্কুলের স্যার। অনেক দিন পরে দেখা। কাছে এগিয়ে গেলাম, সালাম দিতে দিতেই মাস্ক খুললাম, নাম বললাম।
স্যার বসতে বললেন পাশে, বসলাম। খোঁজ খবর নিলেন, কোন ব্যাচ জানতে চাইলেন। এরপর স্যারের মেমোরি খুলে গেলো, আমার কোন কাজিনের কী নাম সেটাও বলে দিলেন। অবধারিতভাবে আলাপের এই ধাপে মেজ কাকা চলে এলেন। প্রয়াত কাকার ব্যাপারে স্যার স্মৃতিচারণ করলেন।
স্যার মাঝে মাঝে ক্লাসে ইংরেজিতে কথা বলতেন, মানে হঠাৎ হঠাৎ কয়েকটা বাক্য বলতেন। খেয়াল করলাম এখনও সেই অভ্যাস রয়েছে। স্যারের পুত্র একটা ভালো জব করে, সেটাও জানালেন। ভালো লাগলো স্যারের ভালো খবরগুলো জানতে। আসলে গুরুজনরা কেউ ভালো না থাকলে আমার খুব মন খারাপ হয়।
স্যার বলছিলেন, এখনও অনেক স্টুডেন্টের সাথে কানেক্টেড আছি, দেখা সাক্ষাৎ হয়। অনেকের সাথে বেশ খোলামেলা সম্পর্ক। যাদের সাথে একটু বেশি ক্লোজ, তাদের সাথে সিগারেটও শেয়ার করি। একটু বিব্রত লাগলেও এটাই সত্য। একটা পর্যায়ে গিয়ে বাবা মা ও শিক্ষকদের সাথে একরকম বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একসময় যে স্যারদের কাছে শিক্ষার্থীরা স্রেফ বাচ্চা ছিলো, সময়ের দীঘির অন্যকোনো কিনারায় গিয়ে সেই একই ব্যাক্তিদের ভেতর একটা বন্ধুসুলভ সম্পর্কে রূপ নেয়। এককালের সেই বাচ্চাদের সাথে স্যারেরা সিরিয়াস আলাপ করতে ভরসা করেন, স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
স্যারের কথা চলছিলো, আমি শুনছিলাম। খুব সম্ভবত ২৩ বছর পরে স্যারের সাথে কথা হওয়া। এরমধ্যে স্যারের পরিচিত কেউ এসে বললেন- চা তো ঠান্ডা হয়ে গেলো। ব্যক্তিটির এমন মন্তব্যে স্যার তাকে কিছু না উত্তর দিয়ে আমার কানের কাছে এসে গলার স্বর নামিয়ে বললেন- ‘Cold Wine & Cold Wife Never Betray!’। এরপর উচ্চস্বরে বললেন- ‘এসব এদেরকে কীভাবে বুঝাবে বলো!’। আমি সামান্য শক খেলেও ভেতরে সফলতার সাথে সামলে নিলাম এবং হেসে দিয়ে স্যারের রসিকতায় যোগ দিলাম।
কিন্তু স্যার যে আমাকে ২৩ বছর পরে এসেও কিছু একটা শেখালেন, আমার মনে হলো- ওয়ান্স অ্যা টিচার, অলওয়েজ টিচার।
ভেবেছিলাম যেহেতু মাত্র দুপুর গড়িয়েছে, বাড়ি গিয়ে বিশ্রাম নিয়ে জরুরী দরকার হলে বাজারে আসবো পড়ন্ত বিকেলে। স্যারকে বললাম, স্যার উঠতে চাই, বাড়িতে যাবো এখন। অনেকদিন বাদে আপনার সাথে দেখা হয়ে খুব ভালো লাগছে। আপনি যদি দয়াকরে অনুমতি দেন, চায়ের বিলটা আমি দিতে চাই স্যার। স্যার বললেন- এর বিল দেয়া হয়ে গিয়েছে। কেউ একজন স্যারকে আগেই চা দিয়ে আপ্যায়ন করে ফেলেছেন। স্যার গিয়েছিলেন দাওয়াত খেতে, সেখান থেকেই মূলত বাজারের চায়ের দোকানে যাত্রাবিরতি।
স্যার বললেন বাড়ি যাবা? ঠিক আছে।
এরপর যা ঘটলো তারজন্য আমি একদমই প্রস্তুত ছিলাম না। স্যার কানের কাছে এসে স্বর নামিয়ে বললেন- একটা বেনসন কিনে চুপিচুপি আমার কোটের পকেটে ঢুকায়ে দিয়ে যাও। আমার কান ততক্ষণে গরম হয়ে গিয়েছে এই আকস্মিক পরিস্থিতে। আমি বললাম, জী স্যার। স্যারকে চা পান করানোর সুযোগ পেলাম না, তবুও কিছু পান করানোর এই তো মোক্ষম সুযোগ!
উঠে প্রথমেই গেলাম স্যারের বসে থাকা চায়ের দোকানের বিক্রেতার কাছে। তিনি জানালেন বেনসন বিক্রি করেন না। তখন পেছন থেকে স্যার ডেকে বললেন, এখানে পাবা না। কোথায় পাওয়া যাবে সেটাও স্যার দেখিয়ে দিলেন।
আমি বেনসন খোঁজার মিশনে নেমে পড়লাম। এবং একটা চান্সেই পেয়ে গেলাম। অবশ্য এই এক চান্সে সঠিক দোকানে ট্রাই করতে পারার পেছনে ছোট্ট একটা কারণ আছে। সেটা একটু বলে নিই।
তখন নবম শ্রেণিতে পড়ি। বাস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি উপজেলা মাঠে প্রাকটিসে যাবো। আমি এথলেট ছিলাম। একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম বাসের জন্য। এরমধ্যে স্কুলের একজন সিনিয়র ভাই দোকানে এসে জিজ্ঞেস করলেন- বিএন্ডএইচ আছে?
দোকানদার বললেন- হ্যাঁ বেনসন আছে।
– একটা দেন।
সিনিয়র ভাই কিনে নিয়ে চলে গেলেন। হয়তো কোন চিপা গলিতে গিয়ে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করবেন। উনার যে বয়স, স্কুলপড়ুয়া ছেলে প্রকাশ্যে ধুম্রপান করা অসম্ভব ছিলো।
তো এটাই মূলত আমার বেনসনের সাথে প্রথম পরিচয় এবং কোন দোকানে গেলে নিশ্চিত পাওয়া যাবে তা চেনার ঘটনা।
দুটো বেনসন অন্য একটি সিগারেটের প্যাকেটে ঢুকিয়ে দিতে বললাম। কিন্তু নিবো কীভাবে? আমার হাতে সিগারেটের বাক্স দেখলে বাজারের অনেক মানুষের চোখ কপালে উঠে যাবে, কয়েক মিনিটের মধ্যে এই খবর পিতৃদেবের কর্ণকুহরে পৌঁছে যাবার সম্ভাবনাও আছে।
প্যান্টের পকেটে টিস্যু ছিলো। বের করে সেগুলো দিয়ে বক্স পেচিয়ে নিলাম। অল্প সময়ের ব্যাপার, এটা নিয়ে ৫০ গজ পাড়ি দিয়েই স্যারের পকেটে চালান করে দিলে আমি মুক্ত!
কিন্তু বিধিবাম! এসে দেখি স্যার চায়ের দোকানে নেই!! আমার কাছে মনে হলো কোন অবৈধ জিনিস নিয়ে এখন দাঁড়িয়ে আছি। এখন আমার কী হবে!
চায়ের দোকানে গিয়ে স্যার কোথায় জিজ্ঞেস করলে, দোকানদার মুচকি হেসে কোনদিকে গিয়েছেন দেখিয়ে দিলেন। গেলাম সেখানে, স্যার নেই। তিনি যেখানে যেখানে থাকতে পারনে বলে জানতে পারলাম সবখানে খুঁজেও পেলাম না।
সিগারেট আমার হাতে থাকতেই পারে, চুল দাড়ি আমার পেকেছে। তারউপর বেনসন, জাতের সিগারেট। তবে অস্বস্তি কাটিয়ে উঠতে পারছিলাম না। আবার নতুন এই পরিস্থিতি আমাকে হাসাচ্ছিলো মনে মনে। সেই হাসি মাঝে মাঝে মুখেও আলতো করে প্রকাশিত হচ্ছিলো। একা একা বাজারের মোড়ে দাঁড়িয়ে হাসতে দেখলে মানুষের মনে কী ধারণা হতে পারে তা আর আপনাদেরকে বলে দিতে হবে না।
আমি নতুন জায়গায় স্যারের খোঁজে হাঁটা শুরু করলাম। কিছুদুর যাওয়ার পর, পেছন থেকে স্যারের ডাক শুনলাম। ওহ! হাঁফ ছাড়লাম ভেতরে ভেতরে।
গিয়ে দেখি স্যার কাকে যেন কিছু একটা লিখে হেল্প করছেন। আমাকে ইশারা দিলেন কোটের পকেটে রাখতে। আমিও অনুগত শিষ্যের মত নির্দেশনা পালন করে, সালাম দিয়ে নিরাপদে স্থান ত্যাগ করলাম।
জীবনে আরও একবার বেনসন নিজেকে আমার স্মৃতিতে জায়গা পাকাপোক্ত করে নিলো।

